counter ইহকাল পরকালের মিল-অমিল

সোমবার, ১৯শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ

ইহকাল পরকালের মিল-অমিল

  • 3
    Shares

ডেস্ক নিউজ : ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের অন্যতম অনুষঙ্গ পরকাল। পরকালের বিশ্বাসের সঙ্গে রয়েছে মানবপ্রকৃতির গভীর যোগসূত্র। কারণ ক্ষণস্থায়ী জীবনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার শেষ নেই। আল্লাহ তাআলা নশ্বর পৃথিবীতে সব চাহিদা বাস্তবায়নের সুযোগ রাখেননি। অপূর্ণতা ও অক্ষমতাই তার নিত্যসঙ্গী। তবে সেসব আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের জন্য আল্লাহ পরকালকে বরাদ্দ রেখেছেন। ইসলাম নির্দেশিত পথে জীবন পরিচালিত করলে পরকালেই আল্লাহ সব চাহিদাই পূর্ণ করার অঙ্গীকার করেছেন। তাই পরকালের বিশ্বাস অবাস্তব কিংবা অবান্তর নয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘ইহকালে আমিই তোমাদের বন্ধু, এবং পরকালেও। সেখানে তোমাদের জন্য থাকবে, যা তোমাদের মন চাইবে। তোমাদের সব দাবি বাস্তবায়নের ব্যবস্থা থাকবে।’ (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত : ৩১-৩২)

সুস্থতা ও স্থায়িত্ব

স্থায়ী হওয়া ও সুস্থ থাকার বাসনা মানবপ্রকৃতির বৈশিষ্ট্য। মৃত্যুকে সে ঘৃণা করে। অসুস্থতা অপছন্দ করে। বার্ধক্য কামনা করে না। সুস্থ থাকার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করে। যৌবন ধরে রাখতে চায়। অসুস্থ হলে টাকা-পয়সা, চিকিৎসা-তদবিরের কমতি রাখে না। এর পরও সে অসুস্থ হয়। সে একদিন মারা যায়। মৃত্যুর চেয়ে নিশ্চিত তার জীবনে দ্বিতীয় কোনো বিষয় নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘জীবন মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে।’ (সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৫৭)

দুনিয়াতে তার এই বাসনা পূর্ণ করা কখনোই সম্ভব নয়; বরং পরকালেই তা সম্ভব। কারণ পরকালের বিশ্বাসই স্থায়ী জীবনের কথা বলে।

চিরকালীন সুস্থতা ও যৌবনের কথা বলে। আল্লাহ বলেন, ‘আজকের দিনে সত্যবাদীদের সত্যবাদিতা তাদের উপকারে আসবে। তাদের জন্য রয়েছে উদ্যান, যার তলদেশে ঝরনা প্রবহমান। তারা তাতে চিরকাল থাকবে।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত : ১১৯)

আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘জান্নাতিদের মধ্যে এক ঘোষক ঘোষণা করবেন, এখানে তোমরা চিরসুস্থ, কখনো অসুস্থ হবে না। তোমরা এখানে নিশ্চিত চিরঞ্জীব, কখনো মৃত্যুমুখে পতিত হবে না। এখানে তোমরা চিরতরুণ, কখনো বৃদ্ধ হবে না। সর্বদা নিয়ামতে ভরপুর থাকবে, কখনো বঞ্চিত হবে না।’ (মুসলিম, হাদিস : ২৮২৭)

পুরস্কার ও তিরস্কার

কর্মের ফল প্রত্যাশা করা মানুষের স্বভাবজাত। চেষ্টা-মেহনত করার পর সে তার প্রতিদান ও যথাযথ মূল্যায়ন চায়। ভালো কাজে পুরস্কৃত হওয়ার অভিপ্রায় এবং মন্দ কাজে তিরস্কৃত হওয়ার শঙ্কা সবার থাকে। কিন্তু কাজের যথাযথ মূল্যায়ন এই পৃথিবীতে অসম্ভব। যত ইনসাফভিত্তিক সমাজই হোক না কেন, ভালো কাজের পুরস্কার ও মন্দ কাজের তিরস্কার শতভাগ বাস্তবে রূপ দেওয়া মানুষের পক্ষে অসম্ভব। পরকালীন বিশ্বাস মানুষকে এমন এক জগতের সন্ধান দেয়, যেখানে প্রত্যেকের প্রতিদান পুরোপুরি বুঝিয়ে দেওয়া হবে। মানুষ তার হিসাবের খাতা নিজেই দেখতে পাবে। অণুপরিমাণ কাজও সেখানে         বাদ যাবে না। সৎকর্মপরায়ণ পাবে পুরস্কার, অপরাধী পাবে শাস্তি। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘যে অণুপরিমাণ সৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে এবং যে অণুপরিমাণ     অসৎকর্ম করবে, সে তা দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল, আয়াত : ৭-৮)

দুনিয়াতে একজন লোক এক শ জনকে খুন করলে তার মৃত্যুদণ্ড একবারই হয়। পক্ষান্তরে পরকালে ‘যতবার অপরাধ ততবার শাস্তি’র কথা বলা হয়েছে। শাস্তি ভোগ করতে করতে যদি সে শাস্তি গ্রহণের অযোগ্য হয়ে পড়ে, তাকে আবার শাস্তির যোগ্য করা হবে। আল্লাহ বলেন, ‘তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে-পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা অন্য চামড়া দিয়ে পাল্টে দেব। যাতে তারা শাস্তি আস্বাদন করতে পারে। নিশ্চয়ই তিনি মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’ (সুরা নিসা, আয়াত : ৫৬)

সৌন্দর্যপ্রীতি

সৌন্দর্যপ্রেম মানুষের মজ্জাগত বৈশিষ্ট্য। সুন্দর গাড়ি, মনোরম বাড়ি এবং চরিত্রবান সুশ্রী নারী তার সারা জীবনের আরাধ্য। কিন্তু ক্ষণস্থায়ী জীবনে সেই সাধ পুরোপুরি মেটানো হয়ে উঠে না কখনো। পৃথিবীর সব সৌন্দর্য ছেড়ে তাকে পরকালে পাড়ি জমাতে হয়। আল্লাহ বলেন, ‘কত বাগান, ঝরনা, ক্ষেত ও সুরম্য প্রাসাদ তারা পেছনে ফেলে এসেছে! (ফেলে এসেছে) কত বিলাসসামগ্রী—যাতে তারা খোশগল্প করত! এমনটিই হয়েছে। আমি অন্য জাতিতে সেসবের উত্তরাধিকার বানিয়েছি। আকাশ ও পৃথিবী তাদের জন্য কাঁদেনি; তারা অবকাশও পায়নি।’ (সুরা দুখান, আয়াত : ২৬-২৯)

পরকালীন বিশ্বাস মানুষকে এমন এক জীবনের আশ্বাস দেয়, যেখানে থাকবে সৌন্দর্যই সৌন্দর্য। জান্নাত হবে মুমিনের চিরসুখময় বাসস্থান, যার সৌন্দর্য পৃথিবীতে কল্পনাতীত। সেই সৌন্দর্যের বর্ণনা দিয়ে হাদিসে কুদসিতে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ বলেন, আমার সৎকর্মশীল বান্দাদের জন্য আমি এমন সব জিনিস তৈরি করে রেখেছি, যা কখনো কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কেউ তা কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।’ (বুখারি, হাদিস : ৪৭৭৯; মুসলিম, হাদিস : ১৮৯)

মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা হেলান দিয়ে বসবে সবুজ সিংহাসন ও সুন্দর কারুকাজ করা গালিচায়।’ (সুরা আর-রহমান, আয়াত : ৭৬)

ত্বরাপ্রবণতা

মানুষ সব বিষয়ে তাড়াহুড়া করে। দ্রুত সময়েই সে সব কিছু শেষ করতে চায়। কর্মের প্রতিদানও পেতে চায় কম সময়ের মধ্যে। আল্লাহ বলেন, ‘সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ ত্বরাপ্রবণ।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩৭)

মানুষের এ স্বভাবকে ইসলাম অবমূল্যায়ন করেনি। তাই হত্যা, ধর্ষণসহ সব বড় অপরাধের শাস্তি দ্রুততম সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক পরিশোধের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। এসব নির্দেশনা সত্ত্বেও নশ্বর পৃথিবীতে সীমাবদ্ধতা আছেই। সব কিছু দ্রুততার সঙ্গে অর্জন করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। তবে পরকালীন জীবনে মুহূর্তেই সব কিছু পেয়ে যাবে মানুষ। জান্নাতের নিয়ামতের বর্ণনায় আল্লাহ বলেন, ‘আমি তাদেরকে তাদের চাহিদা অনুসারে ফলমূল ও গোশতের জোগান দেব।’ (সুরা তুর, আয়াত : ২২)

অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘থোকা থোকা ফলমূল তাদের সম্পূর্ণ আয়ত্তাধীন রাখা হবে।’ (সুরা দাহর, আয়াত : ১৪)

উল্লিখিত আলোচনায় এ কথা সুস্পষ্ট যে মানবপ্রকৃতির সঙ্গে পরকালীন বিশ্বাসের মিল রয়েছে। মহান আল্লাহ মানুষকে সেভাবেই সৃষ্টি করেছেন। তাই মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে পরকালে বিশ্বাসের বিকল্প নেই।

এই বিভাগের আরো খবর